রমজান মাসে ১২ টি বিশেষ প্রস্তুতি

যে কোন কাজে লাগে আমাদের পূর্ব প্রস্তুতি নিতে হয়, আমরা যখন পরীক্ষা দিতে যাই তার আগে আমরা রিহার্সাল করি, যখন মাঠে খেলা হয় তখন তার আগে আমরা প্রস্তুতি নিয়ে থাকি। এরকম ভাবে সকল কাজের আগে আমরা প্রস্তুতি নিয়ে থাকি যাতে ওই কাজটি বিশুদ্ধভাবে পরিপূর্ণ হয়। ঠিক তেমনি রমজান মাস একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস, গুনাহ মাফের মাস, জান্নাত উপার্জনের মাস। এ মাসের আগে আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে যাতে রমজানের রোজাটি পরিপূর্ণভাবে বিশুদ্ধভাবে আদায় করা হয়। এই সম্পর্কে আমরা নিচে বিস্তারিত হয়ে আলোচনা করেছি।

Mar 6, 2024 - 22:37
Apr 20, 2024 - 12:37
 0  17
রমজান মাসে ১২ টি বিশেষ প্রস্তুতি

1. বেশি বেশি তওবা ইস্তেগফার করুনকেউ যদি আল্লাহ কাঠগড়া আ’সামি থাকেন, আগের থেকে তার নামে ম ‘মলা হয়ে থাকে, আগে থেকে তিনি আ’সামি হয়ে থাকেন তাহলে নতুন করে আল্লাহর পক্ষ থেকে নেক আমলের তৌফিক তার জন্য পাওয়া একটু কঠিন । এর জন্য আগে যে অপরাধ গুলো আছে সেজন্য আল্লাহর কাছে তওবা ইস্তেগফার করা। নতুন করে জীবন গড়ার জন্য সংকল্প করতে হবে। রমজান আসছে আমাকে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হবে, এজন্য পিছনে সমস্ত গুনাহ মুছে ফেলতে হবে। সকল গুনাহ জন্য আল্লাহর কাছে মাফ চাইতে হবে এবং নতুনভাবে আবার জীবন গড়তে হবে। অন্যায় কাজ থেকে এখন থেকেই ফিরে আসা এবং আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়া। আল্লাহ তা’আলা যদি মাফ করেন তাহলে ইনশাল্লাহ নতুন করে নেক আমল সুযোগ এবং তৌফিক লাভ করবো ইনশাআল্লাহ।  এখন থেকে বেশি বেশি তওবা ইস্তেগফার করে রমজানের প্রস্তুতি শুরু করি। 

আবু সায়িদ খুদরি (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে বলতে শুনেছিঃ “ইবলিস তার রবকে বলেছেঃ আপনার ইজ্জত ও বড়ত্বের কসম, আমি বনি আদমকে ভ্রষ্ট করতেই থাকব যতক্ষণ তাদের মধ্যে রূহ থাকে। আল্লাহ বলেনঃ আমার ইজ্জত ও বড়ত্বের কসম, আমি তাদের ক্ষমা করতে থাকব যতক্ষণ তারা আমার নিকট  ইস্তেগফার  করে”। [আহমদ]  

সহিহ হাদিসে কুদসি, হাদিস নং ৩২

2. রমজানের ফজিলত ও মাসায়েল জানার চেষ্টা করুন; কোরআন এবং সুন্নায় রমজান মাসে যে সমস্ত ফজিলত মর্যাদা করণীয় কথা বলা হয়েছে, যে সমস্ত উপকারের কথা বলা হয়েছে । সেগুলো এখন থেকে বেশি বেশি আলোচনা করতে হবে, পড়তে হবে, জানতে হবে, এবং কল্পনা করতে হবে, মাথায় বারবার মনে করতে হবে। নিজেকে নিজে বলতে হবে যে রমজান আচ্ছে এ রমজান আমার জান্নাতে যাওয়ার সুযোগ। এ রমজান আল্লাহকে খুশি করার সর্বোত্তম উপায়। এ রমজান জান্নাতের এক বিশেষ গেট দিয়ে প্রবেশ করার সুবর্ণ সুযোগ। এ রমজান আমার সমস্ত গুনাহগুলো মাফ করার উপায়। এ রমজান আমার জীবনকে পরিবর্তন করার উপায়। রমজানের  সকল ফজিলত উপকার করণীয় জানলে আমরা রমজান মাসের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারব ইনশাল্লাহ। 

3. মাগফিরাত ও নাজাত লাভে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন; ক্ষমা এবং মাগফিরাত লাভের জন্য অতিরিক্ত সওয়াব আল্লাহ তা’আলার কাছ থেকে সংরক্ষণ করার জন্য এখন থেকে মানসিকভাবে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে। আমি এ রমজান জীবনের যত রমজান যেভাবে চলে গিয়েছে কমপক্ষে এই রমজান টা আমি হেলায় কাটাবো না। নবি (ﷺ) জীবনের সাত কিংবা আটটি রমজান পেয়েছেন,  সাহাবী কেরাম বেশিরভাগ সাহাবী কেরাম পাঁচ ছয় সাত আটটি রমজান পেয়েছেন। আমরা একেক জন আলহামদুলিল্লাহ জন্ম সূত্রে মুসলমান, আমরা আলহামদুলিল্লাহ প্রাপ্ত বয়স থেকে মৃত্যু পর্যন্ত রমজান ৩০ বা ৪০ বার এর বেশি পাচ্ছি। রমজানের রোজা ফরয যখন হয়েছিল তখন নবীজি (ﷺ) মাত্র 7-8 বছর বেঁচে ছিলেন । তাহলে তারা অল্প কয়েকটি রমজান পেয়েছেন সেগুলোকে এত সুন্দর ভাবে ব্যবহার করেছেন যে তারা জীবনের সফল হয়ে গেছে। বন্ধুগণ আমরা ৩০ ৪০ টা রোজা পেয়েও সেগুলোকে সফলভাবে আদায় করতে পারি না। এর অন্যতম একটি কারণ হলো রমজানের জন্য আমাদের পূর্ব প্রস্তুতি টা ভালোভাবে থাকেনা। অতএব, প্রিয় বন্ধুগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে এ মাসে বরকত ক্ষমা মাগফিরাত এগুলো পাওয়ার জন্য মানসিকভাবে দৃঢ় ভাবে ইচ্ছা এবং প্রতিজ্ঞা করতে হবে। অতিতে আমাদের যত রোজা গিয়েছে তা যেভাবেই কাটুক না কেন কমপক্ষে এ রোজাটা যেন অর্থবহ্য হয় সে চেষ্টা করা।

4. পূর্বের কাজা রোজা থাকলে সেগুলো আদায় করুন; গত রমজানে বা আগের রমজানে কোন রোজা কাজা হয়ে থাকলে এ শাবাণে কাজা রোজাগুলো আগে আদায় করতে হবে। একটি রমজান আসার আগেই পূর্বের কাজা রোজা গুলো আদায় করে রাখতে হয়। 

5. সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইল নিয়ন্ত্রণ করুন; এখন বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়া যুগ। আমরা রমজান মাসে সময় কাটানোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে থাকি। রমজান মাস আমল করার মাস এখানে অহেতুক অর্থহীন কাজ থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। 

আরো পড়ুন রমজানে কয়েকটি করণীয় ও বর্জনীয় কাজ

6. অন্তরকে হিংসা বিদ্বেষ এবং শিরক থেকে পরিচ্ছন্ন করুন; আল্লাহ তা’আলা রমজান মাসে অসংখ্য মানুষকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেন। এই সাধারণ ক্ষমা পাওয়ার জন্য কোন কোন হাদিসে কয়েকটি শর্ত আছে যার মধ্যে একটি হচ্ছে শিরক থেকে মুক্ত এবং হিংসা বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হওয়া। এই রমজান মাসে আল্লাহ তা’আলা অসংখ্য মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাধারণ ক্ষমা  করে দিবেন। আমার নামটাও যেন সেই তালিকায় বিনা কষ্টে ঢুকে যায়  তার জন্য আমাকে দুইটি কাজ বিশেষভাবে করতে হবে,এক অন্তর থেকে হিংসাকে মুছে ফেলতে হবে ,দুই শিরক থেকে নিজেকে পরিচ্ছন্ন এবং পবিএ করতে হবে। এই দুইটি কাজ যদি  করতে পারেন তাহলে রমজান মাসে সাধারণ ক্ষমার জন্য উপযুক্ত হয়ে যাবেন ইনশাল্লাহ।

7. গত রমজানের ভুলগুলোকে চিহ্নিত করুন ; পিছনের যে সমস্ত রমজান আমাদের কেটে গেছে গত বছর আগের বছর বিভিন্ন রমজান চলে গেছে। সেই রমজানগুলোতে আমরা অনেকে আমল করতে পারিনি। রমজানের পরে আমরা আফসোস করি,আফসোস করে কোন লাভ নেই। আগে থেকে ভালো প্রস্তুতি না নিলে আপনার সময় চলে যাবে ঠিকই প্রত্যেক রমজানের পরে আবার আক্ষেপ করবেন। এটা অযথা আফসোস করা। প্রিয় বন্ধুগণ বিগত রমজান গুলোতে আমি কেন আমল করতে পারিনি কেন আমার তারাবিহ পড়া হয় নাই, কেন আমার কোরআন ভালো করে পড়া হয়নাই  একবার,কেন আমার অর্থসহ কুরআন  বুঝা হয় না একবার, কেন আমার প্রচুর পরিমাণ দান করা হয় নাই, কেন মিসকিনদেরকে ইফতার করাতে পারি নাই, কেন রোজাদারকে ইফতার করাতে পারি নাই, কেন দান সদকা করতে পারি নাই,কেন ওই আমলটা  করতে পারি নাই, কেন ইতেকাফ করতে পারি নাই, কি সমস্যা ছিল এগুলো এ রমজানের আগে চিহ্নিত করতে হবে যে গত বছর আমি এগুলো কেন করতে পারি নাই। বন্ধুর কারণে, রুমমেট এর কারণে, টাকার লোভের কারণে কি সমস্যার কারণে সেটা চিহ্নিত করতে হবে  পরে এই বছর রমজানের আগে আগে সেই কারণগুলো  থেকে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করতে হবে। তাহলে ইনশাআল্লাহ সুন্দরভাবে এবং ভালোভাবে কাটাতে পারবেন। আল্লাহ তা’আলা আমাদের তৌফিক দান করুক (আমিন)। 

8. রমজান মাসের আমলগুলোর রিহার্সাল করুন ; রমজানের যে নেক আমলগুলো আছে সেগুলো শাবান মাস থেকে প্রস্তুতিমূলক রিহার্সাল শুরু করে দিতে হবে। রমজান আসছে এজন্য শাবান মাস থেকে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতে হবে নবীজি (ﷺ) শাবান মাসে রোজা শিখিয়েছেন। এখন থেকে কোরাআন পড়তে অভ্যাস করা, যাতে রমজান মাসে কোরআন পড়তে সুবিধা হয়। তাহলে এখন থেকে রমজানের আমলগুলো রিহার্সাল করতে হবে। 

9. পুরো রমজান মাসের সময়সূচী নির্ধারণ করুন; রমজান মাস যাতে সুন্দরভাবে ব্যবহার করতে পারি তার জন্য রমজান মাসে ২৪ ঘন্টার রুটিন করতে হবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিউটিতে থাকি বা যেখানেই থাকি, আমি কোন মুহূর্ত টি কিভাবে আল্লাহ তা’আলা কে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করব। ডিউটির সময় কোন মুহূর্তটিতে আমি কিভাবে আল্লাহ তা’আলাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করব। রুমে আসার পর আমি কিভাবে আমার মালিককে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করব। কিভাবে আল্লাহর অসন্তষ্টির দিক থেকে ফিরে আসবো। পুরো দিনের ছক আঁকা। এটা এখন থেকে তালিকা করে নেওয়া। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘন্টার সকল আমল এবং কাজের তালিকা লিপিবদ্ধ করতে হবে যাতে অযথা সময় নষ্ট না হয়।

10. শাবান মাসের শেষ দিনে রমজানের চাঁদ দেখার চেষ্টা করুন; এখন আমরা আজকাল রমজান মাসের চাঁদ উঠেছে কিনা সেটা দেখার জন্য আমরা টিভি,মোবাইল, রেডিওর দিকে তাকায়। এই চাঁদ দেখার সুন্নাহ টি পৃথিবী থেকে বিদায় হওয়ার  পথে। চাঁদ দেখার কমিটির লোকজন চাঁদ দেখবে ঠিক আছে কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের চাঁদ দেখার চেষ্টা করতে হবে। এই সুন্নাহটি পৃথিবী থেকে বিদায় হওয়ার পথে। চাঁদ দেখার একটি দোয়া নবীজি (ﷺ) শিক্ষা দিয়েছেন :-

اَللَّهُمَّ أَهْلِلْهُ عَلَيْنَا بِالْيُمْنِ وَالْإِيْمَانِ وَالسَّلَامَةِ وَالْإِسْلَامِ رَبِّيْ وَرَبُّكَ اللَّهُ

হে আল্লাহ্‌! আমাদের জন্য চাঁদটিকে বারাকাতময় (নিরাপদ), ঈমান, নিরাপত্তা ও শান্তির বাহন করে উদিত করো। হে নতুন চাঁদ আল্লাহ্‌ তা'আলা আমারও প্রভু, তোমারও প্রভু।

রাসূলুল্লাহ্‌ (ﷺ) নতুন চাঁদ দেখলে এ দোয়া বলতেন। রমযান ও সকল মাসের নতুন চাঁদ দেখে এ দোয়া পাঠ করা মাসনূন।

রেফারেন্সঃ সহীহ। তিরমিজিঃ ৩৪৫১

অতএব আমাদের শাবান মাসের শেষ দিনে পশ্চিম আকাশে চাঁদ দেখার জন্য  অনুসন্ধান করতে হবে

11. আল্লাহ তা’আলার কাছে তৌফিক কামনা করুন; রমজান মাসে বেশি বেশি নেক আমল করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা। আল্লাহ তা’আলা তৌফিক না দিলে কোন আমল করা সম্ভব হবে না। 

12. বেশি বেশি নফল রোজা রাখুন ; আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, ‘নবী (ﷺ) শাবান মাস চাইতে বেশি নফল রোযা অন্য কোন মাসে রাখতেন না। নিঃসন্দেহে তিনি পূর্ণ শাবান মাস রোযা রাখতেন।’

অন্য বর্ণনায় আছে, ‘অল্প কিছুদিন ছাড়া তিনি পূর্ণ শা‘বান মাস রোযা রাখতেন।’

রিয়াদুস সলেহিন, হাদিস নং ১২৫৫

উপরোক্ত সকল আলোচনা থেকে আমরা যা শিখতে পেরেছি তার ওপর আল্লাহ তা’আলা আমাদের আমল করার তৌফিক দান করুক। (আমিন) 

বক্তা: শায়খ আহমাদুল্লাহ 

 হাদিস সোর্স: আল হাদিস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow