ইতিকাফের ফজিলত

দুনিয়াদারীর ঝামেলা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়া, বিনয় নম্রতায় নিজেকে আল্লাহর দরবারে সমপর্ণ করা এবং বিশেষ করে লাইলাতুল কদরে ইবাদত করার সুযোগ লাভ করাই ই‘তিকাফের উদ্দেশ্য।

Mar 29, 2024 - 20:07
Apr 20, 2024 - 12:31
 0  12
ইতিকাফের ফজিলত

ইতেকাফ কি

ইতেকাফ শব্দের অর্থ স্থির থাকা, আবদ্ধ থাকা, অবস্থান করা।শরিয়তের পরিভাষায়, মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন বা যেকোনো দিন দুনিয়াবি সব কাজকর্ম তথা পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মসজিদে বা ঘরের পবিত্র স্থানে ইবাদতের নিয়তে অবস্থান করাকে ইতেকাফ বলে।

ইতেকাফের গুরুত্ব 

খুব লজ্জার কথা আমাদের দেশে অনেক মসজিদে টাকা দিয়ে ইতেকাফের জন্য লোক ভাড়া করা লাগে।  নবী করিম(ﷺ)রমজানে রোজা ফরজ হওয়া থেকে নিয়ে তার ওফাতের আগ পর্যন্ত একটিবারের জন্য এই আমলটি ছাড়েননি।যে আমলটি নবী করিম (ﷺ)এই আমলটি একটিবারের জন্য ছাড়ে নাই এই আমলটি বেশিরভাগ লোক জীবনে একবারও করিনি।আল্লাহ তা’আলা বলেন

وَاِذۡ جَعَلۡنَا الۡبَيۡتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَاَمۡنًا ؕ وَاتَّخِذُوۡا مِنۡ مَّقَامِ اِبۡرٰهٖمَ مُصَلًّى​ ؕ وَعَهِدۡنَآ اِلٰٓى اِبۡرٰهٖمَ وَاِسۡمٰعِيۡلَ اَنۡ طَهِّرَا بَيۡتِىَ لِلطَّآٮِٕفِيۡنَ وَالۡعٰكِفِيۡنَ وَالرُّکَّعِ السُّجُوۡدِ‏ 

এবং স্মরণ কর যখন আমি কা‘বাগৃহকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র এবং নিরাপদস্থল করলাম এবং বললাম, ‘মাকামে ইবরাহীমকে সলাতের স্থান হিসেবে গ্রহণ কর’ এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে বলেছিলাম, ‘আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ই‘তিকাফকারী এবং রুকূ ও সাজদাহকারীদের জন্য পবিত্র রাখবে’।(সূরা বাকার-125)

ইতেকাফের ফজিলত

লাইলাতুল কদর হলো রমজান মাসের একটি মর্যাদাপূর্ণ রাত।এরা টি পাওয়ার জন্য অন্যতম একটি কাজ হল ইতেকাফ করা।আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,

আমি কুরআনকে কাদরের রাতে নাযিল করেছি,তুমি কি জান ক্বাদরের রাত কী?ক্বাদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও অধিক উত্তম,এ রাতে ফেরেশতা আর রূহ তাদের রব-এর অনুমতিক্রমে প্রত্যেক কাজে অবতীর্ণ হয়।(এ রাতে বিরাজ করে) শান্তি আর শান্তি- ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত।(সূরা আল কদর:১-৫)

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

নবী (ﷺ)  বলেছেনঃ যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদ্‌রে ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রাত জেগে ‘ইবাদাত করে, তার পিছনের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করা হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমযানে সিয়াম পালন করবে, তারও অতীতের সমস্ত গোনাহ মাফ করা হবে। সহিহ বুখারী, হাদিস ১৯০১

লাইলাতুল কদর অর্জনের সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজ উপায় হল, রমাদানের শেষ 10 দিন  ইতেকাফ করা।রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কখনো ইতেকাফের আমলটি ছাড়েননি। 

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! যদি আমি “লাইলাতুল ক্বদ্র’’ জানতে পারি তাহলে সে রাতে কি বলব? 

তিনি বললেনঃতুমি বল 

اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

হে আল্লাহ! তুমি সম্মানিত ক্ষমাকারী, তুমি মাফ করতেই পছন্দ কর, অতএব তুমি আমাকে মাফ করে দাও”।

জামে' আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৫১৩

ইতেকাফ কখন করব

২০ রমজান সূর্যাস্ত যাওয়ার আগে মসজিদে ঢুকতে হবে।এরপর থেকে ঈদের চাঁদ দেখার আগ পর্যন্ত মসজিদে থাকতে হবে। 

আবূ সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, আমি আবূ সা’ঈদ খুদ্‌রী (রাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম, আমার সঙ্গে খেজুর বাগানে চলুন, (হাদীস সংক্রান্ত) আলাপ আলোচনা করব। তিনি বেরিয়ে আসলেন। আবূ সালামা (রাঃ) বলেন, আমি তাকে বললাম, ‘লাইলাতুল কাদ্‌র’ সম্পর্কে নবী (ﷺ) হতে যা শুনেছেন, তা আমার নিকট বর্ণনা করুন। তিনি বললেন, আল্লাহ্‌র রসূল (ﷺ) রমযানের প্রথম দশ দিন ‘ ইতিকাফ  করলেন। আমরাও তাঁর সঙ্গে ই’তিকাফ করলাম। জিবরীল (আঃ) এসে বললেন, আপনি যা তালাশ করছেন, তা আপনার সামনে রয়েছে। অতঃপর তিনি মধ্যবর্তী দশদিন ই’তিকাফ করলেন, আমরাও তাঁর সঙ্গে ই’তিকাফ করলাম। পুনরায় জিবরীল (আঃ) এসে বললেন, আপনি যা তালাশ করছেন, তা আপনার সামনে রয়েছে। অতঃপর রমযানের বিশ তারিখ সকালে নবী (ﷺ) খুত্‌বা দিতে দাঁড়িয়ে বললেন, যারা আল্লাহ্‌র নবীর সঙ্গে ই’তিকাফ করেছেন, তারা যেন ফিরে আসেন (আবার ই’তিকাফ করেন) কেননা, আমাকে স্বপ্নে ‘লাইলাতুল কাদ্‌র’ অবগত করানো হয়েছে। তবে আমাকে তা (নির্ধারিত তারিখটি) ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে তা শেষ দশ দিনের কোন এক বেজোড় তারিখে। স্বপ্নে দেখলাম যেন আমি কাদা ও পানির উপর সিজদা করছি। তখন মসজিদের ছাদ খেজুরের ডাল দ্বারা নির্মিত ছিল। আমরা আকাশে কোন কিছুই (মেঘ) দেখিনি, একখণ্ড হালকা মেঘ আসল এবং আমাদের উপর (বৃষ্টি) বর্ষিত হল। নবী (ﷺ) আমাদের নিয়ে 

সালাত আদায় করলেন। এমন কি আমি আল্লাহ্‌র রসূল  (ﷺ)-এর কপাল ও নাকের অগ্রভাগে পানি ও কাদার চিহ্ন দেখতে পেলাম। এভাবেই তাঁর স্বপ্ন সত্যে রূপ লাভ করল।  

সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৮১৩

আরো একটি হাদিসে এসেছে,  আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (ﷺ) রমযানের শেষ দশকে  ইতিকাফ  করতেন এবং বলতেনঃ তোমরা রমযানের শেষ দশকে [৩] লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।  

ফুটনোট:   [৩] আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমের সূরা ক্বদরে ঘোষণা করেছেন- লাইলাতুল ক্বদর হাজার মাসের (ইবাদাতের) চেয়েও উত্তম। সহীহ শুদ্ধ হাদীস থেকে জানা যায় যে, লাইলাতুল ক্বদর রমযানের শেষ দশ দিনের যে কোন বিজোড় রাত্রিতে হয়ে থাকে। বিভিন্ন সহীহ হাদীসে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখে লাইলাতুল ক্বদর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখিত আছে। হাদীসে এ কথাও উল্লেখিত আছে, যে কোন একটি নির্দিষ্ট বিজোড় রাত্রিতেই তা হয় না। (অর্থাৎ কোন বছরে ২৫ তারিখে হল, আবার কোন বছরে ২১ তারিখে হল এভাবে। আমাদের দেশে সরকারী আর বেসরকারীভাবে জাঁকজমকের সঙ্গে ২৭ তারিখের রাত্রিকে লাইলাতুল ক্বদরের রাত হিসেবে পালন করা হয়। এভাবে মাত্র একটি রাত্রিকে লাইলাতুল ক্বদর সাব্যস্ত করার কোনই হাদীস নাই। লাইলাতুল ক্বদরের সওয়াব পেতে চাইলে ৫টি বিজোড় রাত্রেই তালাশ করতে হবে।

বর্তমানে রাত্রি জাগরণের জন্য মসজিদে সকলে সমবেত হয়ে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলের যে ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে সেটিও নবাবিষ্কৃত কাজ। কারণ আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সময়ে সাহাবীদের নিয়ে মসজিদে জাগরিত হয়ে বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে ইবাদত না করে নিজ নিজ পরিবারকে জাগিয়ে কিয়ামুল লাইল পালন করতেন।  

সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০২০

 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow